আজকের বিশ্বে গণতন্ত্রের আলোচনা খুবই প্রচলিত। বিশ্বের অনেক দেশই গণতন্ত্রকে তাদের শাসনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে, এবং মানুষের কাছে গণতন্ত্রের মূল আকর্ষণ হলো তাদের মতামতের প্রাধান্য। কিন্তু ইসলাম কেনো গণতন্ত্রকে হারাম বলে? ইসলাম কেনো এই ব্যবস্থা সমর্থন করে না? ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর কারণগুলো ব্যাখ্যা করার আগে গণতন্ত্র এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার পার্থক্য বোঝা জরুরি।
গণতন্ত্র এবং ইসলাম: মূল পার্থক্য
গণতন্ত্র বলতে সাধারণত বোঝানো হয়, এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে শাসন পরিচালিত হয়। গণতন্ত্রের মূল ধারণা হল, “জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের শাসন”। এখানে জনগণ শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। জনগণ নিজেদের নেতা নির্বাচন করে, আইন প্রণয়ন করে এবং দেশ পরিচালনা করে। অপরদিকে ইসলাম অনুযায়ী আল্লাহর আইনই একমাত্র চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় বিধান। ইসলামী শাসনব্যবস্থা আল্লাহর আদেশকে চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করে এবং জীবন পরিচালনার সকল দিকেই আল্লাহর নির্দেশনাকে প্রাধান্য দেয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের অসঙ্গতি
গণতন্ত্রের মূল কাঠামো ইসলামের শাসন ব্যবস্থার সাথে সরাসরি দ্বন্দ্ব তৈরি করে। নিচে ইসলামের আলোকে গণতন্ত্রের কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরা হলো:
১. সার্বভৌমত্বের সংঘাত
ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী, আল্লাহই শাসনের একমাত্র অধিকারী। শাসন এবং আইন প্রণয়নের সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর কাছে রয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর আইন অনুসারে বিচার করে না, সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত।” (সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৪৪)
অপরদিকে, গণতন্ত্রে আইন প্রণয়ন এবং পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে জনগণের হাতে থাকে, যা ইসলাম অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহর আদেশের বিপরীতে কোনো মানবীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ইসলাম সমর্থন করে না।
২. ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্ম এবং রাষ্ট্রকে পৃথক রাখা হয়। এক্ষেত্রে ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, কিন্তু ইসলাম ধর্ম ও জীবনকে পৃথক মনে করে না। ইসলামে আল্লাহর নির্দেশনা মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং ইসলাম ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহর বিধান মেনে চলার কথা বলে। কুরআনের ভাষায়:
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম।” (সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৩)
৩. সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত বনাম আল্লাহর বিধান
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত। তবে ইসলামে ন্যায় এবং সত্যকে সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। জনগণের মতামত বা পছন্দের উপর ভিত্তি করে কোনো বিষয়কে বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম বিশ্বাস করে, ন্যায় এবং সত্য সর্বদা আল্লাহর বিধানের মধ্যেই নিহিত।
৪. মানব আইন বনাম আল্লাহর চিরন্তন বিধান
গণতন্ত্রে আইন প্রণয়ন করা হয় জনগণের মনোভাব এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে। মানুষ চাইলেই যেকোনো আইন পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু ইসলামে আইন প্রণয়নের একমাত্র উৎস হলো কুরআন এবং সুন্নাহ, যা আল্লাহর প্রণীত এবং যা চিরন্তন। মানুষ পরিবর্তনশীল এবং সীমাবদ্ধ জ্ঞান রাখে, কিন্তু আল্লাহর বিধান শাশ্বত এবং সকল যুগের জন্য উপযুক্ত।
৫. নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা
গণতন্ত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপক প্রাধান্য রয়েছে এবং এতে অনেক সময় ইসলামের নিষিদ্ধ কাজও বৈধতা পায়। ইসলাম ব্যক্তি স্বাধীনতাকে স্বীকার করে, কিন্তু এর একটি নির্দিষ্ট সীমানা এবং নিয়ম রয়েছে। ব্যক্তির স্বাধীনতার নামে অনৈতিক কার্যকলাপ যেমন—মদ্যপান, জুয়া খেলা, বা অশ্লীলতার প্রসার—ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলামি জীবনযাত্রায়, আল্লাহর বিধান মোতাবেক ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ থাকে।
ইসলামের বিকল্প শাসনব্যবস্থা: খিলাফত
ইসলামে শাসনের আদর্শ মডেল হচ্ছে “খিলাফত”, যেখানে আল্লাহর আইন মেনে শাসনকার্য পরিচালিত হয়। খলিফা বা শাসক আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসন করেন এবং মানুষকেও সেই আইন মেনে চলার নির্দেশ দেন। খিলাফতের মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করা, যেখানে মানুষের মঙ্গল এবং কল্যাণ নিহিত।
উপসংহার
ইসলামের দৃষ্টিতে গণতন্ত্রের মূল সমস্যা হলো এতে মানুষের মতামতের উপর শাসনের ভিত্তি স্থাপন করা হয়, যা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামে সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র আল্লাহর এবং শাসনব্যবস্থাও আল্লাহর বিধানের উপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হওয়া উচিত। এ কারণেই ইসলামের দৃষ্টিতে গণতন্ত্রকে হারাম বলা হয় এবং মুসলিমদের জন্য খিলাফতের আদর্শ গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।


এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান