"জ্ঞান ও ধর্মের পরিপূর্ণতার পথে"

আবুল আলা মওদুদী ছিলেন জামায়াতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দর্শনের জন্য পরিচিত। তবে তার কিছু মতবাদ ও বিশ্বাস ইসলামের মূল আকিদা এবং শাস্ত্রীয় ফিকহের সাথে সাংঘর্ষিক বলে বহু আলেমের সমালোচনার মুখে পড়েছে। মওদুদীর এই ভ্রান্ত আক্বীদাগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন, কারণ অনেকেই তার লেখনী থেকে প্রভাবিত হয়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন। নিচে মওদুদীর কিছু বিতর্কিত এবং ভ্রান্ত বিশ্বাস তুলে ধরা হলো, যেগুলো বিশিষ্ট আলেমরা ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছেন:

১. নবীগণ গোনাহগার ছিলেন:

মওদুদী তার লেখনীতে বলেন, “সমস্ত নবীই গোনাহগার ছিলেন।” এই বক্তব্যটি সরাসরি ইসলামের মূল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, নবীগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত এবং তারা গোনাহ থেকে মুক্ত, অর্থাৎ ‘মাসুম’।
সূত্র: তাফহীমাত, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৭

২. নবী ও সাহাবাদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য:

মওদুদী আরও বলেন, “নবী এবং সাহাবাদের মধ্যে লোভ, লালসা, ঘৃণা, কার্পণ্য এবং স্বার্থপরতা ছিল। এই কারণেই ওহুদ যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়েছিলেন।” নবী এবং সাহাবাদের প্রতি এমন বক্তব্য ইসলামের মূল শিক্ষার সাথে সম্পূর্ণ বিরোধপূর্ণ।
সূত্র: তাফহীমুল কুরআন, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০, ৯৯ নং টীকা

৩. কুরআনের পরিবর্তন হয়েছে:

তিনি দাবি করেছেন, “কুরআন নাযিল হওয়ার একশো বছর পরে তা পরিবর্তিত হয়ে গেছে।” ইসলামের মূল বিশ্বাস অনুযায়ী, কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে সংরক্ষিত এবং এর কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সূত্র: কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা, পৃ. ১৪-১৫

৪. রেসালতের দায়িত্ব পালনে নবীজির ভুল:

মওদুদী বলেন, “আমাদের নবী (সা.) রেসালতের দায়িত্ব পালনে ভুল করেছেন।” ইসলামের শিক্ষায় নবীগণ ভুলের ঊর্ধ্বে এবং তারা আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলেন, তাই এমন মন্তব্য করা সম্পূর্ণভাবে ভ্রান্ত।
সূত্র: তাফহীমুল কুরআন, ১৯ খণ্ড, পৃ. ২৮৬, ৪ নং টীকা

৫. নবীজির দাড়ি নিয়ে মন্তব্য:

মওদুদী তার লেখনীতে বলেন, “নবী আ.-এর মতো লম্বা দাড়ি রাখা বা অন্যান্য কাজ করা মারাত্মক বিদআত এবং ইসলামের বিকৃতি।” এমন বক্তব্য ইসলামের সুন্নাহ এবং নবীজির অনুসরণের গুরুত্বকে খাটো করে।
সূত্র: রাসায়েল ও মাসায়েল, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮২-১৮৩

৬. হাদিসের উপর বিশ্বাস না রাখার পরামর্শ:

তিনি দাবি করেছেন, “হাদিসের মাধ্যমে যা কিছু প্রাপ্ত হয়, তা সঠিকভাবে বিশ্বাস করা যায় না।” অথচ হাদিস ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস এবং নবীজির জীবন ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সূত্র: তরজমানুল কুরআন, পৃ. ২৬৭, খণ্ড ২৬, সংখ্যা ৩

৭. রজম শাস্তিকে জুলুম আখ্যা:

মওদুদী বলেন, “নর-নারীর অবাধ মেলামেশার কারণে রজম শাস্তি প্রয়োগ করা জুলুম।” অথচ ইসলামে জেনাকারীদের জন্য রজম শাস্তি আল্লাহর বিধান।
সূত্র: তাফহীমাত, ২/২৮১

৮. ফেরেশতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা:

মওদুদী দাবি করেন, “ফেরেশতারা সেই সত্তা, যাকে মুশরিকরা দেব-দেবী হিসেবে স্থির করেছে।” ইসলামের শিক্ষায় ফেরেশতারা আল্লাহর নিযুক্ত বিশেষ সত্তা, যারা নির্দিষ্ট কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
সূত্র: তাজদীদ ও ইহইয়ায়ে দ্বীন, পৃ. ১০

৯. হযরত আদম (আ.) সম্পর্কে মন্তব্য:

তিনি লিখেছেন, “হযরত আদম (আ.) মানবিক দুর্বলতায় আক্রান্ত ছিলেন।” ইসলামের মতে, হযরত আদম (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী এবং তিনি গোনাহ থেকে মুক্ত ছিলেন।
সূত্র: তাফহীমুল কুরআন, ৩/১২৩

১০. হযরত নূহ (আ.) সম্পর্কে ভুল ধারণা:

মওদুদী বলেন, “হযরত নূহ (আ.) চিন্তার দিক থেকে দ্বীনের প্রয়োজন থেকে সরে গিয়েছিলেন।” নবীজিরা আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলেন এবং তারা দ্বীনের প্রতি সর্বদা সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত থাকেন।
সূত্র: তাফহীমুল কুরআন, ২/৩৪৪

১১. হযরত মূসা (আ.) এর ভুল:

তিনি দাবি করেন, “হযরত মূসা (আ.) নবুয়তের পূর্বে একটি কবীরা গুনাহ করেছিলেন।” অথচ নবীগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে নির্বাচিত এবং তারা বড় কোনো গুনাহ করেন না।
সূত্র: রাসায়েল ও মাসায়েল, ১/৩১

১২. মহানবী (সা.) এর মানবিক দুর্বলতা:

মওদুদী লিখেছেন, “মহানবী মুহাম্মদ (সা.) মানবিক দুর্বলতার বশবর্তী হয়ে গোনাহ করেছিলেন।” নবীজিরা গোনাহ থেকে মুক্ত এবং তাদের জীবন আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিচালিত, এমন দাবি করা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।
সূত্র: তরজমানুল কুরআন, সংখ্যা ৮৫, পৃ. ২৩০

১৩. কুরআনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রান্ত মত:

মওদুদী বলেন, “কুরআন শুধুমাত্র হেদায়াতের জন্য, নাজাতের জন্য নয়।” অথচ কুরআন হলো সর্বজনীন নাজাতের পথনির্দেশিকা।
সূত্র: তাফহীমুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩২১

সমাপ্তি:

উপরোক্ত মতামতগুলো মওদুদীর লেখনী থেকে প্রাপ্ত যা তাকে ইসলামের মূলধারার বাইরে রেখেছে। বহু আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ তার এই মতামতগুলোকে ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন। ইসলামের মূল শিক্ষার ভিত্তিতে মওদুদীর মতবাদ থেকে সচেতন থাকা এবং সঠিক ইসলামিক আকিদা অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান