"জ্ঞান ও ধর্মের পরিপূর্ণতার পথে"

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের প্রতিটি সম্পর্ক, অনুভূতি ও পরিস্থিতি মোকাবিলার সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বিবাহ হলো এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যা দুজন মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তবে কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি আসে, যখন বিবাহ সম্পর্ক ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়, এবং তখন ইসলামে তালাকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যদিও এটি হালাল, আল্লাহর নিকট তালাককে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

কেন তালাককে নিকৃষ্ট হালাল কাজ বলা হয়েছে?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তালাক আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ।” (আবু দাউদ)। এ কথা থেকে বোঝা যায় যে, যদিও তালাক বৈধ বা হালাল, এটি আল্লাহর নিকট প্রিয় নয়। কারণ, বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন, যা পরিবার ও সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে। এই বন্ধন ভেঙে গেলে কেবল স্বামী-স্ত্রীর জীবনেই প্রভাব পড়ে না, বরং সন্তানদের ভবিষ্যৎ, পরিবার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও ব্যাহত হয়। তাই ইসলাম তালাককে শেষ উপায় হিসেবে দেখতে বলে।

তালাকের আগে যা করা উচিত

ইসলাম আমাদের তালাকের আগে সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করতে উৎসাহিত করে। কিছু ধাপ রয়েছে, যা সম্পর্ক রক্ষা এবং ভুল বোঝাবুঝি মেটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ:

১. পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান: বিবাহে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো খোলামেলা আলোচনা। উভয় পক্ষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. মধ্যস্থতা: যদি নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হয়, তবে পরিবারের সদস্য বা সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্যস্থতা করা যেতে পারে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা যদি তাদের মধ্যে মতভেদ আশঙ্কা কর, তাহলে এক পুরুষের পক্ষ থেকে একজন এবং এক নারীর পক্ষ থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর। তারা মীমাংসা করতে চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিল করে দেবেন।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৫)।

৩. সময় এবং ধৈর্য: কখনো কখনো সময় নেয়া এবং ধৈর্য ধারণ করা সম্পর্ক রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা সিদ্ধান্ত সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তালাকের প্রভাব

তালাক শুধু দুজন মানুষকে আলাদা করে দেয় না, এটি পুরো পরিবার এবং বিশেষত সন্তানদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে, তাদের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়, এবং অনেক সময় তারা সামাজিক এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই ইসলাম তালাকের আগে বারবার চিন্তা-ভাবনা করার এবং বিকল্প পথে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছে।

যখন তালাকই একমাত্র উপায়

তবে কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি আসে যখন সম্পর্কটি বজায় রাখা মানসিক, শারীরিক, এবং ধর্মীয়ভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। যখন কোনো সম্পর্ক আর সম্মান, ভালোবাসা এবং নিরাপত্তার জায়গায় থাকে না, তখন ইসলামে তালাকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যদি তারা পৃথক হয়, তবে আল্লাহ প্রত্যেককে তার প্রশস্ততা থেকে অভাবমুক্ত করবেন।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৩০)। এটি বোঝায় যে, তালাকের পরে জীবন থেমে থাকে না; বরং আল্লাহ নতুন সুযোগ, শান্তি এবং সমাধানের পথ খুলে দেন।

উপসংহার

তালাক ইসলামে হালাল হলেও, এটি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ। সম্পর্কের মাঝে সমস্যা দেখা দিলে তালাকের দিকে যাওয়ার আগে আলোচনার মাধ্যমে, ধৈর্য ধারণ করে এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করা উচিত। তবে যদি সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন তালাকের পথে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে, যাতে উভয় পক্ষ নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিবাহের পবিত্রতা রক্ষা করার তৌফিক দিন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করুন।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান